ব্লগার এবং ওয়ার্ডপ্রেস ওয়েবসাইটে গুগল এডসেন্স অ্যাপ্রুভাল গাইডলাইন ২০২৬: একটি পরিপূর্ণ ব্লুপ্রিন্ট
অনলাইনে আয় করার যতগুলো মাধ্যম আছে, তার মধ্যে ব্লগিং এবং গুগল এডসেন্স হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য উপায়। আপনি যদি ঘরে বসে নিজের জ্ঞান শেয়ার করে ডলার আয় করতে চান, তবে এর চেয়ে ভালো রাস্তা আর নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, দিন যত যাচ্ছে গুগল এডসেন্স পাওয়ার নিয়মগুলো তত কঠিন হচ্ছে। আজ থেকে ৫ বছর আগে যেভাবে সহজেই এডসেন্স পাওয়া যেত, ২০২৬ সালে এসে সেই চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন গুগল কোয়ালিটি বা মানের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে।
অনেকেই শখ করে বা অন্যের দেখাদেখি ওয়েবসাইট খোলেন, কিন্তু সঠিক নির্দেশনার অভাবে দিনের পর দিন পরিশ্রম করেও এডসেন্স অ্যাপ্রুভাল পান না। গুগল যখন লো ভ্যালু কন্টেন্ট বা পলিসি ভায়োলেশনের মেইল পাঠায়, তখন হতাশা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। এই আর্টিকেলে আমি একজন অভিজ্ঞ বড় ভাই বা বন্ধুর মতো করে আপনাকে হাতে-কলমে শেখাবো যে, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে কিভাবে একটি ব্লগার বা ওয়ার্ডপ্রেস ওয়েবসাইট তৈরি করলে এবং আর্টিকেল লিখলে গুগল আপনাকে ফেরাতে পারবে না। আমি এখানে কোনো কঠিন প্রযুক্তিগত ভাষা ব্যবহার করব না, যাতে একদম নতুন কেউও এটি পড়ে সফল হতে পারেন। চলুন শুরু করা যাক আমাদের মিশন।
ব্লগার নাকি ওয়ার্ডপ্রেস: এডসেন্সের জন্য কোনটি সেরা
সবার প্রথমে যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, আমি কি ব্লগারে সাইট বানাবো নাকি ওয়ার্ডপ্রেসে? দেখুন, গুগল এডসেন্স পাওয়ার জন্য প্ল্যাটফর্ম কোনো বাধা নয়। গুগল ব্লগার এবং ওয়ার্ডপ্রেস দুটিকেই সমান চোখে দেখে। তবে এদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে যা আপনার জানা জরুরি।
ব্লগার হলো গুগলের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি। এখানে আপনাকে হোস্টিং কিনতে হয় না, এবং সাইট হ্যাক হওয়ার ভয় থাকে না। আপনি যদি একদম নতুন হন এবং আপনার পকেটে বিনিয়োগ করার মতো টাকা না থাকে, তবে ব্লগার দিয়ে শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ। ব্লগারেও কাস্টম ডোমেইন যুক্ত করে খুব সহজেই এডসেন্স পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ওয়ার্ডপ্রেস হলো প্রফেশনালদের পছন্দ। এখানে আপনাকে ডোমেইন এবং হোস্টিং কিনতে হবে, অর্থাৎ কিছু টাকা খরচ করতে হবে। কিন্তু ওয়ার্ডপ্রেসে আপনি সাইটটিকে নিজের ইচ্ছামতো সাজাতে পারবেন। এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের জন্য ওয়ার্ডপ্রেস সেরা। ২০২৬ সালে প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে ওয়ার্ডপ্রেসের অ্যাডভান্সড ফিচারগুলো আপনাকে অনেক এগিয়ে রাখবে।
আমার পরামর্শ হলো, যদি সামর্থ্য থাকে তবে ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে শুরু করুন। আর যদি বাজেট না থাকে, তবে ব্লগারে শুরু করুন এবং পরে আয় হলে ওয়ার্ডপ্রেসে শিফট করুন। মনে রাখবেন, এডসেন্স আপনার কন্টেন্টের মান দেখবে, আপনি কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন তা নয়।
ডোমেইন সিলেকশন: নাম এবং বয়স কত হতে হবে
একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন বা নাম হলো তার পরিচয়। এডসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে ডোমেইনের গুরুত্ব অপরিসীম। অনেকেই প্রশ্ন করেন, ফ্রি ডোমেইন বা সাব-ডোমেইনে (যেমন .blogspot.com) কি এডসেন্স পাওয়া যায়? উত্তর হলো, হ্যাঁ পাওয়া যায়। কিন্তু এতে সময় অনেক বেশি লাগে এবং প্রফেশনাল মনে হয় না। তাই আমার পরামর্শ হলো, অবশ্যই একটি টপ লেভেল ডোমেইন বা টিএলডি কিনুন।
ডট কম (.com) ডোমেইন হলো সবার সেরা। এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য। যদি ডট কম না পান তবে ডট নেট (.net) বা ডট ওর্গ (.org) নিতে পারেন। ভুলেও ডট টিলকে (.tk) বা ডট এমএল (.ml) এর মতো ফ্রি ডোমেইন ব্যবহার করবেন না, এগুলোতে এডসেন্স পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
এখন আসি ডোমেইনের বয়সের কথায়। অফিসিয়ালি গুগল কোথাও বলেনি যে ডোমেইনের বয়স ৬ মাস হতে হবে। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, একদম নতুন ডোমেইনে এডসেন্স পেতে একটু কষ্ট হয়। একটি ডোমেইন কেনার পর অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ দিন বয়স হলে সেটি গুগলের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়। তবে যদি আপনার কন্টেন্ট বা লেখা অসাধারণ মানের হয়, তবে ১৫ দিনের পুরাতন ডোমেইনেও এডসেন্স পাওয়া সম্ভব। কিন্তু নিরাপদ থাকার জন্য সাইটের বয়স ১ মাস হওয়ার পরেই আবেদন করা উচিত।
ওয়েবসাইটের ডিজাইন এবং থিম কাস্টমাইজেশন
গুগল এডসেন্স টিম যখন আপনার সাইট ভিজিট করবে, তখন তারা সবার আগে দেখবে আপনার সাইটটি দেখতে কেমন এবং এটি ব্যবহার করা কতটা সহজ। একে বলা হয় ইউজার এক্সপেরিয়েন্স। আপনার সাইট যদি হিজিবিজি হয়, মেনু খুঁজে পাওয়া না যায়, বা লোড হতে অনেক সময় নেয়, তবে আপনি রিজেক্ট খাবেন।
একটি হালকা এবং দ্রুত লোড হয় এমন থিম ব্যবহার করুন। ওয়ার্ডপ্রেসের জন্য জেনারেটপ্রেস বা অ্যাস্ট্রা থিম এবং ব্লগারের জন্য এসইও অপটিমাইজড রেস্পন্সিভ থিম ব্যবহার করুন। ফন্ট সাইজ এমন রাখুন যেন মোবাইল এবং কম্পিউটার দুই জায়গাতেই স্পষ্টভাবে পড়া যায়। কারণ 2026 সালে ৮০ শতাংশ ভিজিটর মোবাইল থেকে আসবে।
ন্যাভিগেশন বার বা মেনু বারটি খুব পরিষ্কার রাখুন। হোম, ক্যাটাগরি এবং পেজগুলো যেন সহজেই চোখে পড়ে। সাইটের ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা বা খুব হালকা রঙের রাখা ভালো, এতে লেখার পাঠযোগ্যতা বাড়ে। অহেতুক গ্যাজেট, ঘড়ি, ক্যালেন্ডার বা ঝিকিমিকি এনিমেশন সাইটে রাখবেন না। এগুলো সাইট স্লো করে এবং আনপ্রফেশনাল দেখায়।
গুগল এডসেন্স পাওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক পেজসমূহ
আপনার ওয়েবসাইটে হাজার হাজার আর্টিকেল থাকলেও যদি নির্দিষ্ট কিছু পেজ না থাকে, তবে আপনি এডসেন্স পাবেন না। এই পেজগুলো আপনার সাইটের বৈধতা এবং স্বচ্ছতা প্রমাণ করে। নিচে এই চারটি পেজ সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হলো:
১. এবাউট আস (About Us)
এই পেজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আপনার বা আপনার টিমের পরিচয় থাকতে হবে। আপনি কে, কেন এই ব্লগটি খুলেছেন, এবং এই ব্লগে মানুষ কি ধরনের তথ্য পাবে তা বিস্তারিত লিখুন। ২০২৬ সালে গুগল E-E-A-T (অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, কর্তৃত্ব এবং বিশ্বাসযোগ্যতা) এর ওপর খুব জোর দিচ্ছে। তাই নিজেকে একজন এক্সপার্ট হিসেবে তুলে ধরুন।
২. কন্টাক্ট আস (Contact Us)
ভিজিটররা যাতে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারে, তার জন্য একটি ফর্ম বা ইমেইল এড্রেস দিন। এটি সাইটের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়। একটি প্রফেশনাল ইমেইল ব্যবহার করা ভালো।
৩. প্রাইভেসি পলিসি (Privacy Policy)
এটি একটি আইনি পেজ। এখানে লেখা থাকে আপনি ভিজিটরদের কোনো তথ্য সংগ্রহ করছেন কিনা বা কুকিজ ব্যবহার করছেন কিনা। অনলাইনে অনেক ফ্রি প্রাইভেসি পলিসি জেনারেটর পাওয়া যায়, সেগুলো দিয়ে সহজেই এই পেজ তৈরি করতে পারেন।
৪. টার্মস এন্ড কন্ডিশনস (Terms and Conditions)
আপনার সাইট ব্যবহারের নিয়মাবলী এখানে লেখা থাকে। ডিস্কলেইমার পেজটিও এর সাথে যুক্ত করতে পারেন।
এই পেজগুলো তৈরি করে ফুটার মেনু বা মেইন মেনুতে অবশ্যই যুক্ত করবেন। এগুলো ছাড়া আবেদন করলে পলিসি ভায়োলেশনের কারণে বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ১০০ ভাগ।
আর্টিকেল লেখার নিয়ম
কোয়ালিটি কন্টেন্ট বা রাজার মতো লেখা
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে, যা হলো আর্টিকেল বা কন্টেন্ট। মনে রাখবেন, কন্টেন্ট ইজ কিং। আপনার সাইটের ডিজাইন খারাপ হতে পারে, কিন্তু লেখা যদি ভালো হয় তবে এডসেন্স পাবেন। কিন্তু লেখা খারাপ হলে পৃথিবীর সেরা ডিজাইন দিয়েও কিছু হবে না।
কিভাবে আর্টিকেল লিখবেন:
আপনার লেখা হতে হবে ১০০% ইউনিক বা মৌলিক। অন্যের লেখা কপি-পেস্ট করা তো দূরের কথা, অন্যের আইডিয়া হুবহু কপি করাও যাবে না। গুগল এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে লেখা কন্টেন্ট খুব সহজেই ধরতে পারে। তাই চ্যাটজিপিটি বা অন্য এআই দিয়ে লিখে সরাসরি পোস্ট করবেন না। নিজের ভাষায়, মানুষের আবেগের সাথে মিশিয়ে লিখুন।
আর্টিকেলের শব্দ সংখ্যা:
অনেকে ৩০০ বা ৫০০ শব্দের আর্টিকেল লিখেন। ২০২৬ সালে এসে ৫০০ শব্দের আর্টিকেল দিয়ে এডসেন্স পাওয়া খুব কঠিন। প্রতিটি আর্টিকেল কমপক্ষে ৮০০ থেকে ১০০০ শব্দের হতে হবে। কিছু কিছু পিলার কন্টেন্ট বা বিস্তারিত আর্টিকেল ১৫০০ থেকে ২০০০ শব্দের রাখার চেষ্টা করুন। বড় আর্টিকেল মানেই বেশি তথ্য, আর গুগল তথ্যসমৃদ্ধ লেখাকে পছন্দ করে।
কয়টি আর্টিকেল লাগবে:
এডসেন্স আবেদনের আগে আপনার সাইটে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি উচ্চমানের আর্টিকেল থাকা উচিত। এই আর্টিকেলগুলো যেন বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সাজানো থাকে। যেমন, আপনি যদি টেকনোলজি নিয়ে লেখেন, তবে মোবাইল টিপস, কম্পিউটার টিপস, এবং ইন্টারনেট অফার এই তিনটি ক্যাটাগরিতে ১০টি করে পোস্ট রাখতে পারেন।
ভাষার ব্যবহার:
আপনি বাংলা বা ইংরেজি যে ভাষাতেই লিখুন না কেন, ব্যাকরণগত ভুল যেন না থাকে। চলিত এবং সাধু ভাষার মিশ্রণ করবেন না। প্যারাগ্রাফগুলো ছোট ছোট করুন। একটানা বড় লেখা পড়তে মানুষের বিরক্ত লাগে। প্রতি ৩-৪ লাইন পর পর প্যারাগ্রাফ পরিবর্তন করুন। গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলো বোল্ড বা হাইলাইট করুন।
ইমেজ বা ছবির ব্যবহার:
প্রতিটি আর্টিকেলে অন্তত একটি ফিচার ইমেজ ব্যবহার করবেন। গুগল থেকে সরাসরি ডাউনলোড করা ছবি ব্যবহার করলে কপিরাইট সমস্যা হতে পারে। ক্যানভা বা অন্য এডিটর দিয়ে নিজের মতো করে ছবি বানিয়ে নিন। ছবির নিচে অল্ট টেক্সট (Alt Text) দিতে ভুলবেন না, এটি এসইও-এর জন্য খুব জরুরি।
ট্রাফিক বা ভিজিটর কত থাকতে হবে
এটি একটি বড় ভুল ধারণা যে এডসেন্স পেতে হলে হাজার হাজার ভিজিটর লাগে। সত্য কথা হলো, গুগল এডসেন্স অ্যাপ্রুভালের জন্য ট্রাফিকের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। দিনে ১০ জন ভিজিটর থাকলেও আপনি এডসেন্স পেতে পারেন, আবার দিনে ১০,০০০ ভিজিটর থাকলেও রিজেক্ট হতে পারেন যদি কন্টেন্ট খারাপ হয়।
তবে, একেবারে জিরো ট্রাফিক নিয়ে আবেদন করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যখন আপনার সাইটে কিছু অর্গানিক ট্রাফিক (গুগল সার্চ থেকে আসা ভিজিটর) থাকে, তখন গুগল বোঝে যে সাইটটি মানুষের উপকারে আসছে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে প্রচুর ট্রাফিক এনে এডসেন্স পাওয়ার চেষ্টা করবেন না, এতে অনেক সময় ইনভ্যালিড ক্লিক বা লো ভ্যালু কন্টেন্টের সমস্যা দেখায়। চেষ্টা করুন আবেদনের সময় যেন আপনার সাইটে প্রতিদিন অন্তত ৫০ থেকে ১০০ জন ভিজিটর থাকে। এটা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং গুগলের কাছে সাইটের ভ্যালু তৈরি করবে।
কোন ধরনের ওয়েবসাইটে দ্রুত এডসেন্স পাওয়া যায়
নিশ বা বিষয় নির্বাচন করা হলো সফলতার অর্ধেক চাবিকাঠি। সব বিষয়ে গুগল দ্রুত এডসেন্স দেয় না। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে কিছু নির্দিষ্ট টপিক বা নিশ আছে যেগুলোতে কাজ করলে আপনি দ্রুত সফলতা পাবেন।
১. টেকনোলজি এবং গ্যাজেট রিভিউ
নতুন মোবাইল, ল্যাপটপ বা অ্যাপস নিয়ে রিভিউ লিখলে খুব দ্রুত এডসেন্স পাওয়া যায়। এই টপিকের চাহিদা সবসময় থাকে।
২. শিক্ষা এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইন
চাকরির খবর, পড়াশোনার টিপস, বিসিএস প্রস্তুতি বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে সাইট বানালে তা দ্রুত র্যাংক করে এবং এডসেন্সও সহজে পাওয়া যায়।
৩. স্বাস্থ্য ও ফিটনেস
স্বাস্থ্য সচেতনতা, ডায়েট প্ল্যান, বা ব্যায়াম নিয়ে লিখতে পারেন। তবে সাবধান, ডাক্তারি পরামর্শ দেবেন না যদি আপনি ডাক্তার না হন। সাধারণ টিপস শেয়ার করুন।
৪. পার্সোনাল ফিন্যান্স বা অর্থায়ন
কিভাবে টাকা সঞ্চয় করা যায়, ইনভেস্টমেন্ট, বা ব্যাংকিং সেবা নিয়ে লিখলে হাই সিপিসি (Cost Per Click) পাওয়া যায়। অর্থাৎ এখানে ইনকাম বেশি।
৫. লাইফস্টাইল এবং ট্রাভেল ব্লগ
ভ্রমণের গল্প বা দৈনন্দিন জীবনের টিপস নিয়েও ভালো ব্লগ তৈরি করা যায়।
যেসব বিষয় এড়িয়ে চলবেন:
মুভি ডাউনলোড সাইট, গানের লিরিক্স (কপিরাইট ইস্যু), জুয়া বা বেটিং সাইট, অ্যাডাল্ট কন্টেন্ট, হ্যাকিং শেখানো, বা মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনো বিষয় নিয়ে সাইট বানাবেন না। এগুলোতে গুগল কখনোই এডসেন্স দেয় না।
এডসেন্স আবেদনের আগে চেকলিস্ট
আপনি যখন মনে করবেন আপনার সাইট প্রস্তুত, তখন আবেদনের আগে নিচের এই চেকলিস্টটি মিলিয়ে নিন:
১. আপনার সাইটে কি কাস্টম ডোমেইন সঠিকভাবে যুক্ত হয়েছে? (SSL বা https:// চালু আছে কি না দেখুন)।
২. সাইটের ডিজাইন কি রেস্পন্সিভ এবং মোবাইল ফ্রেন্ডলি?
৩. চারটি জরুরি পেজ (About, Contact, Privacy, Terms) কি আছে এবং মেনুতে যুক্ত করা হয়েছে?
৪. সাইটে কি কমপক্ষে ২৫-৩০টি ইউনিক আর্টিকেল আছে?
৫. প্রতিটি আর্টিকেল কি ইন্ডেক্স হয়েছে? (গুগল সার্চ কনসোলে চেক করুন)।
৬. সাইটের মেনু এবং ক্যাটাগরি কি ফাঁকা আছে? (কোনো লিংকে ক্লিক করলে যদি পেজ নট ফাউন্ড দেখায় তবে ঠিক করুন)।
৭. সাইট কি গুগল সার্চ কনসোল এবং গুগল এনালিটিক্সে যুক্ত করা হয়েছে?
এই সবগুলোর উত্তর যদি "হ্যাঁ" হয়, তবে আপনি আবেদনের জন্য প্রস্তুত।
গুগল এডসেন্স আবেদনের প্রক্রিয়া
আবেদন করা খুব সহজ। প্রথমে গুগল এডসেন্স এর ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার জিমেইল দিয়ে সাইন আপ করুন। তারপর আপনার ওয়েবসাইটের লিংক দিন। গুগল আপনাকে একটি কোড দেবে। সেই কোডটি আপনার ওয়েবসাইটের হেড ট্যাগের (<head>) নিচে বসাতে হবে। ব্লগারে থিম এডিট অপশনে গিয়ে এবং ওয়ার্ডপ্রেসে হেডার ফোল্ডারে গিয়ে এটি করতে হয়। কোড বসানোর পর সাবমিট করুন।
সাধারণত গুগল ২ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নেয়। কিন্তু সাইট ভালো হলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেও সুখবর চলে আসে। এই সময়টাতে ধৈর্য ধরুন এবং নিয়মিত নতুন আর্টিকেল পোস্ট করতে থাকুন। ভুলেও সাইটের থিম পরিবর্তন করবেন না বা কোড রিমুভ করবেন না।
সাধারণ ভুলসমূহ এবং লো ভ্যালু কন্টেন্ট ফিক্স
সবচেয়ে বেশি মানুষ রিজেক্ট খায় "লো ভ্যালু কন্টেন্ট" এর কারণে। এর মানে হলো আপনার লেখায় নতুন কোনো তথ্য নেই। আপনি এমন বিষয় নিয়ে লিখেছেন যা ইন্টারনেটে ইতিমধ্যে হাজার হাজার বার লেখা হয়েছে।
সমাধান:
নিজস্ব মতামত যুক্ত করুন। লেখার ভঙ্গি পরিবর্তন করুন। তথ্যের সাথে চার্ট, গ্রাফ বা পরিসংখ্যান দিন। এমন টপিক খুঁজুন যা নিয়ে খুব কম মানুষ লিখেছে। একে বলা হয় মাইক্রো-নিশ।
আরেকটি ভুল হলো "স্ক্র্যাপড কন্টেন্ট"। অর্থাৎ বিভিন্ন সাইট থেকে অল্প অল্প করে লেখা নিয়ে জোড়াতালি দেওয়া। গুগল এটি ধরে ফেলে। তাই সম্পূর্ণ নিজের ভাষায় লিখুন।
২০২৬ সালের ভবিষ্যৎ এবং শেষ কথা
২০২৬ সালে ব্লগিং জগতটা অনেক স্মার্ট হয়েছে। এখন শুধু লিখলেই হবে না, লেখার মধ্যে ভ্যালু বা মূল্য থাকতে হবে। পাঠক যেন আপনার লেখা পড়ে উপকৃত হয়। গুগল চায় ইউজাররা সঠিক তথ্য পাক। আপনি যদি ইউজারের কথা মাথায় রেখে কাজ করেন, তবে গুগল আপনাকে পুরস্কৃত করবেই।
এডসেন্স পাওয়া কোনো রকেট সায়েন্স নয়। এটি ধৈর্যের খেলা। প্রথমবার রিজেক্ট হলে হতাশ হবেন না। গুগলের মেইলটি ভালো করে পড়ুন, তারা বলে দেয় সমস্যা কোথায়। সেই অনুযায়ী সাইট ঠিক করুন এবং আবার আবেদন করুন। মনে রাখবেন, একবার এডসেন্স পেয়ে গেলে এবং সাইটটি ঠিকমতো চালিয়ে নিতে পারলে, এটি আপনার আজীবনের আয়ের উৎস হতে পারে।
এফএকিউ (FAQ) - সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: আমার ডোমেইনের বয়স মাত্র ১০ দিন, আমি কি আবেদন করতে পারব?
উত্তর: টেকনিক্যালি আপনি পারবেন, কিন্তু এটি সুপারিশ করা হয় না। আপনার সাইটের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য অন্তত ৩০ দিন অপেক্ষা করা এবং নিয়মিত কন্টেন্ট পোস্ট করা উচিত। তাড়াহুড়ো করলে রিজেক্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
প্রশ্ন ২: আমি কি চ্যাটজিপিটি বা এআই দিয়ে আর্টিকেল লিখে এডসেন্স পাব?
উত্তর: গুগল এআই লেখা বিরোধী নয়, কিন্তু তারা "মানহীন" লেখা বিরোধী। আপনি যদি এআই দিয়ে লিখে হুবহু পেস্ট করে দেন এবং তাতে তথ্যের ভুল থাকে বা মানুষের পড়ার অনুপযুক্ত হয়, তবে এডসেন্স পাবেন না। এআইকে সাহায্যকারী হিসেবে নিন, কিন্তু লেখাটা নিজের মতো করে এডিট এবং হিউম্যানাইজ করে নিন।
প্রশ্ন ৩: কপি-পেস্ট করে কি এডসেন্স পাওয়া সম্ভব?
উত্তর: একেবারেই না। গুগল এখন অনেক স্মার্ট। আপনি যদি অন্যের লেখা কপি করেন, তবে প্লেজিয়ারিজম বা কপিরাইট ভায়োলেশনের কারণে আপনার সাইট ব্যান হতে পারে। ১০০% ইউনিক লেখা ছাড়া এডসেন্স এর স্বপ্ন দেখা বোকামি।
প্রশ্ন ৪: ব্লগারে সাব-ডোমেইন (.blogspot.com) দিয়ে কি এডসেন্স পাওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, পাওয়া যায়। কিন্তু এতে সময় অনেক বেশি লাগে এবং প্রফেশনাল মনে হয় না। তাছাড়া সাব-ডোমেইনে আয় কিছুটা কম হতে পারে। ৩০০-৫০০ টাকা খরচ করে একটি কাস্টম ডোমেইন (.com) কিনে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদী সফলতার জন্য ভালো।
প্রশ্ন ৫: প্রতিদিন কয়টি আর্টিকেল পোস্ট করতে হবে?
উত্তর: সংখ্যার চেয়ে ধারাবাহিকতা বেশি জরুরি। আপনি যদি প্রতিদিন ১টি করে পোস্ট করতে পারেন, সেটা খুবই ভালো। যদি তা না পারেন, তবে সপ্তাহে অন্তত ৩-৪টি পোস্ট করুন। কিন্তু এমন করবেন না যে একদিনে ১০টি দিলেন আর পরে ১০ দিন খবর নেই।
প্রশ্ন ৬: ইংরেজিতে লিখলে কি এডসেন্স তাড়াতাড়ি পাওয়া যায় নাকি বাংলায়?
উত্তর: ভাষার ওপর এডসেন্স পাওয়া নির্ভর করে না। আপনি যে ভাষায় দক্ষ, সেই ভাষাতেই লিখুন। তবে ইংরেজি কন্টেন্টের সিপিসি (CPC) বা আয়ের হার বাংলা কন্টেন্টের চেয়ে সাধারণত বেশি হয়। কিন্তু বাংলায় প্রতিযোগিতা কিছুটা কম, তাই র্যাংক করা সহজ।
প্রশ্ন ৭: আমার সাইটে ছবি বেশি, লেখা কম। আমি কি এডসেন্স পাব?
উত্তর: গুগল এডসেন্স মূলত টেক্সট বা লেখার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। যদি শুধু ছবি থাকে (যেমন ওয়ালপেপার সাইট) এবং লেখা খুব কম থাকে, তবে "লো ভ্যালু কন্টেন্ট" এর কারণে রিজেক্ট হতে পারেন। ছবির সাথে পর্যাপ্ত বর্ণনা বা টেক্সট থাকতে হবে।
প্রশ্ন ৮: অন্য অ্যাড নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে কি গুগল এডসেন্স পাওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, পাওয়া যায়। তবে আবেদনের সময় সাইটকে পরিষ্কার রাখাই ভালো। অনেক সময় নিম্নমানের অ্যাড নেটওয়ার্কের অ্যাড থাকলে সাইটের ইউজার এক্সপেরিয়েন্স নষ্ট হয়, যা এডসেন্স পাওয়ার পথে বাধা হতে পারে। এডসেন্স পাওয়ার পর আপনি অন্য অ্যাড ব্যবহার করতে পারেন।
প্রশ্ন ৯: এডসেন্স পেতে সর্বনিম্ন কত ট্রাফিক লাগে?
উত্তর: গুগলের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। তবে অর্গানিক ট্রাফিক থাকাটা পজিটিভ সাইন। যদি আপনার সাইট গুগল সার্চ কনসোলে ভেরিফাইড থাকে এবং কিছু ভিজিটর সার্চ করে আসে, তবে তা এপ্রুভালের জন্য যথেষ্ট। ট্রাফিক ছাড়া পাওয়া যায়, কিন্তু তা কঠিন।
প্রশ্ন ১০: রিজেক্ট হলে কতদিন পর আবার আবেদন করব?
উত্তর: রিজেক্ট হওয়ার সাথে সাথেই আবার আবেদন করবেন না। প্রথমে রিজেকশনের কারণটি বুঝুন। সাইটে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনুন, আরও ৫-১০টি নতুন আর্টিকেল লিখুন। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিন সময় নিয়ে সাইটটি ইম্প্রুভ করে তারপর আবার আবেদন করা উচিত।
প্রশ্ন ১১: নিউজ সাইটে কি এডসেন্স পাওয়া সহজ?
উত্তর: নিউজ সাইটে প্রচুর কন্টেন্ট থাকে তাই ট্রাফিক পাওয়া সহজ, কিন্তু এখানে কপি কন্টেন্টের ঝুঁকি থাকে। যদি আপনি নিজস্ব সোর্স থেকে ইউনিক খবর পরিবেশন করতে পারেন, তবে নিউজ সাইটে খুব দ্রুত এডসেন্স পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ১২: ওয়ার্ডপ্রেস বা ব্লগারে কোন থিম ব্যবহার করব?
উত্তর: এমন থিম ব্যবহার করুন যা লাইটওয়েট বা হালকা। ওয়ার্ডপ্রেসের জন্য Astra বা GeneratePress এবং ব্লগারের জন্য JetTheme বা GalaxyOne এর মতো এসইও ফ্রেন্ডলি থিমগুলো এডসেন্স পাওয়ার জন্য খুব জনপ্রিয়।
উপসংহার
প্রিয় বন্ধুরা, এই গাইডলাইনটি ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে তৈরি করা হয়েছে। প্রযুক্তি বদলায়, কিন্তু মৌলিক নিয়মগুলো একই থাকে সততা এবং গুণগত মান। আপনি যদি শর্টকাট না খুঁজে পরিশ্রম করার মানসিকতা নিয়ে আগান, তবে গুগল এডসেন্স আপনার হাতের মুঠোয় আসবেই। আজই একটি ডোমেইন কিনুন, সুন্দর একটি পরিকল্পনা করুন এবং লেখা শুরু করুন। আপনার সফলতার গল্প শোনার অপেক্ষায় রইলাম। শুভকামনা!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন