আপনি কি জানেন যে google adsense এখনো online income করার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য এবং নিশ্চিত উপায়গুলোর মধ্যে একটি? কিন্তু বন্ধুরা, সত্যি কথা বলতে কি, আজ থেকে ৫-১০ বছর আগে যেভাবে ব্লগিং করে বা ওয়েবসাইট বানিয়ে টাকা আয় করা যেত, ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সেই নিয়মগুলো আর কাজ করছে না। প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষের পড়ার অভ্যাস বদলেছে এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো গুগলের অ্যালগরিদম এখন অনেক বেশি স্মার্ট।
আজকের এই বিশাল আর্টিকেলে আমি আপনাদের সাথে এমনভাবে কথা বলবো যেন আমি আপনার সামনে বসে আছি। আমি কোনো কঠিন কঠিন টেকনিক্যাল শব্দ ব্যবহার করবো না। একদম সহজ বাংলায় বুঝিয়ে বলবো যে, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আপনি যদি নতুন করে গুগল এডসেন্স থেকে ইনকাম শুরু করতে চান, তাহলে আপনাকে ঠিক কোন কোন পথে হাঁটতে হবে। এটি শুধু একটি আর্টিকেল নয়, এটি আপনার ডিজিটাল ক্যারিয়ারের একটি ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা। ধৈর্য ধরে প্রতিটি লাইন পড়ুন, কারণ এই লেখাটি আপনার জীবন বদলে দিতে পারে।
গুগল এডসেন্স আসলে কী এবং কেন এটি সেরা
সহজ কথায়, গুগল এডসেন্স হলো গুগলের একটি প্রোগ্রাম যা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বা ওয়েবসাইট মালিকদের তাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেখানোর মাধ্যমে টাকা আয় করার সুযোগ দেয়। যখন কোনো ভিজিটর আপনার ওয়েবসাইটে আসে এবং গুগল দ্বারা দেখানো বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে বা বিজ্ঞাপনটি দেখে, তখন আপনি টাকা পান।
এখন প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালে এসেও কেন এডসেন্স সেরা? কারণ হলো এর বিশ্বস্ততা। ইন্টারনেটে হাজার হাজার অ্যাড নেটওয়ার্ক আছে, কিন্তু গুগলের মতো পেমেন্ট নিশ্চয়তা কেউ দেয় না। প্রতি মাসের ২১ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা চলে আসবে, যদি আপনি সঠিক নিয়মে কাজ করেন। কোনো স্ক্যাম বা প্রতারণার ভয় নেই।
২০২৬ সালের জন্য মানসিক প্রস্তুতি: শর্টকাট খুঁজবেন না
সবার আগে নিজের মনকে স্থির করুন। আপনি যদি ভাবেন যে আজ ওয়েবসাইট খুলবো আর কাল থেকে ডলার বৃষ্টি হবে, তাহলে দয়া করে এখানেই পড়া বন্ধ করুন। এডসেন্স হলো একটি বিজনেস। একটা দোকান দিতে গেলে যেমন সময়, শ্রম এবং ধৈর্য লাগে, এখানেও তাই। ২০২৬ সালে গুগল "কোয়ালিটি" বা গুণমান ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। এআই (AI) দিয়ে লেখা কপি-পেস্ট কন্টেন্ট বা অটোমেটেড ব্লগিংয়ের দিন শেষ। এখন গুগল চায় মানুষের লেখা, মানুষের জন্য লেখা। তাই আপনাকে পরিশ্রম করার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামতে হবে।
ধাপ ১: সঠিক নিস বা বিষয় নির্বাচন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)
অধিকাংশ নতুন ব্লগার শুরুতেই ভুল করেন বিষয় নির্বাচনে। তারা ভাবেন, আমি সব বিষয় নিয়ে লিখবো। খবর, খেলা, রান্না, টেকনোলজি সব এক ওয়েবসাইটে। এটি বিশাল ভুল। ২০২৬ সালে আপনাকে হতে হবে "স্পেশালিস্ট"। আপনাকে একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা "মাইক্রো নিস" বেছে নিতে হবে।
জনপ্রিয় এবং বেশি আয়ের কিছু নিস আইডিয়া:
১. পার্সোনাল ফিন্যান্স বা অর্থ ব্যবস্থাপনা: লোন, ইন্স্যুরেন্স, শেয়ার মার্কেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি (সতর্কতার সাথে), বাজেট তৈরি। এই বিষয়গুলোতে বিজ্ঞাপনের রেট (CPC) অনেক বেশি থাকে।
২. স্বাস্থ্য ও ফিটনেস: ওজন কমানো, ইয়োগা, মানসিক স্বাস্থ্য, ঘরোয়া চিকিৎসা। তবে এখানে আপনাকে খুব সাবধান হতে হবে, ভুল তথ্য দেওয়া যাবে না।
৩. টেকনোলজি ও সফটওয়্যার রিভিউ: নতুন মোবাইল, ল্যাপটপ, বা বিভিন্ন সফটওয়্যার কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তার টিউটোরিয়াল।
৪. শিক্ষা ও ক্যারিয়ার: সরকারি চাকরির প্রস্তুতি, বিদেশে পড়াশোনা, স্কিল ডেভেলপমেন্ট।
৫. অটোমোবাইল বা গাড়ি: বাইক বা গাড়ির মেইনটেন্যান্স, রিভিউ।
এমন বিষয় বাছুন যা আপনি ভালো বোঝেন এবং যা নিয়ে আপনি আগামী ৫ বছর ক্লান্ত না হয়ে লিখতে পারবেন।
ধাপ ২: ডোমেইন এবং হোস্টিং নির্বাচন
বিষয় ঠিক করার পর আপনার দরকার একটি নাম বা ডোমেইন। ডোমেইন হলো আপনার ওয়েবসাইটের ঠিকানা (যেমন google.com)।
ডোমেইন কেনার সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন:
১. ডট কম (.com) ডোমেইন নেওয়ার চেষ্টা করুন। এটি মানুষের মনে থাকে এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য।
২. নাম ছোট এবং সহজ রাখুন। উচ্চারণে যেন কষ্ট না হয়।
৩. নামের মধ্যে আপনার নিস বা বিষয়ের কিওয়ার্ড থাকলে ভালো। যেমন, আপনি যদি টেকনোলজি নিয়ে লেখেন, নামের সাথে Tech শব্দটি থাকলে ভালো।
হোস্টিং বা সার্ভার:
আপনার ওয়েবসাইটের ফাইলগুলো যেখানে জমা থাকবে তাকে হোস্টিং বলে। ২০২৬ সালে সাইটের স্পিড বা গতি র্যাংকিংয়ের জন্য অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর। তাই সস্তা বা ফ্রি হোস্টিং ব্যবহার না করে ভালো মানের হোস্টিং কিনুন। শুরুতে শেয়ার্ড হোস্টিং দিয়ে কাজ চালাতে পারেন, তবে প্রোভাইডার যেন ভালো হয়। স্পিড স্লো হলে ভিজিটর বিরক্ত হয়ে চলে যাবে, আর গুগলও আপনাকে র্যাংক দেবে না।
প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন: ব্লগার নাকি ওয়ার্ডপ্রেস?
এটি একটি চিরন্তন প্রশ্ন। ব্লগার (Blogger.com) গুগলের নিজস্ব ফ্রি প্ল্যাটফর্ম। এখানে হোস্টিং ফ্রি, ডোমেইন কানেক্ট করলেই চলে। কিন্তু এর কাস্টমাইজেশন বা সাজানোর ক্ষমতা সীমিত।
অন্যদিকে ওয়ার্ডপ্রেস (WordPress) হলো বস। এখানে আপনি যা খুশি তাই করতে পারেন। হাজার হাজার প্লাগইন আছে যা আপনার কাজ সহজ করে দেবে। ২০২৬ সালে প্রফেশনাল কাজ করতে চাইলে ওয়ার্ডপ্রেসই সেরা। তবে বাজেট না থাকলে ব্লগার দিয়ে শুরু করতে পারেন, পরে টাকা আয় করে ওয়ার্ডপ্রেসে শিফট করবেন।
ধাপ ৩: ওয়েবসাইট সাজানো এবং পলিসি পেজ তৈরি
এডসেন্স পাওয়ার জন্য আপনার ওয়েবসাইটটি দেখতে পরিচ্ছন্ন এবং পেশাদার হতে হবে। অগোছালো সাইট গুগল পছন্দ করে না।
থিম বা টেমপ্লেট:
হালকা এবং দ্রুত লোড হয় এমন থিম ব্যবহার করুন। ফালতু এনিমেশন বা স্লাইডার দিয়ে সাইট ভারী করবেন না। মোবাইল ফ্রেন্ডলি থিম হতে হবে, কারণ ৯০% ভিজিটর মোবাইল দিয়ে আপনার সাইট দেখবে।
আবশ্যিক পেজসমূহ:
গুগল এডসেন্স এপ্রুভালের জন্য নিচের পেজগুলো থাকা বাধ্যতামূলক। এগুলো না থাকলে আবেদন করবেন না, রিজেক্ট খাবেন।
১. About Us (আমাদের সম্পর্কে): আপনি কে, এই সাইট কেন, এখানে কী পাওয়া যায় এবং আপনার লক্ষ্য কী—এসব বিস্তারিত লিখুন।
২. Contact Us (যোগাযোগ): আপনার ইমেইল এড্রেস বা একটি কন্টাক্ট ফর্ম দিন যাতে মানুষ আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
৩. Privacy Policy (গোপনীয়তা নীতি): এটি অত্যন্ত জরুরি। অনলাইনে জেনারেটর দিয়ে এটি বানিয়ে নিতে পারেন।
৪. Terms and Conditions (শর্তাবলী): সাইট ব্যবহারের নিয়মকানুন।
৫. Disclaimer (দাবিত্যাগ): বিশেষ করে স্বাস্থ্য বা ফিন্যান্স সাইটের জন্য এটি খুব জরুরি।
মেনু বার বা নেভিগেশন:
আপনার সাইটের মেনু বার যেন স্পষ্ট হয়। হোম, ক্যাটাগরি এবং পেজগুলো যেন সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়।
ধাপ ৪: হাই কোয়ালিটি কন্টেন্ট বা আর্টিকেল লেখা (আসল খেলা)
২০২৬ সালে কন্টেন্ট ইজ কিং (Content is King) কথাটি আরো বেশি শক্তিশালী। কিন্তু কন্টেন্ট হতে হবে "হিউম্যান-ফার্স্ট"। অর্থাৎ মানুষের জন্য লেখা।
কীভাবে আর্টিকেল লিখবেন?
১. কিওয়ার্ড রিসার্চ: লেখার আগে জানুন মানুষ কী লিখে গুগলে সার্চ করছে। গুগল প্ল্যানার বা উবারসাজেস্ট এর ফ্রি ভার্সন ব্যবহার করে লো-কম্পিটিশন কিওয়ার্ড বের করুন।
২. আর্টিকেলের দৈর্ঘ্য: 2026 সালে ছোট আর্টিকেল (৩০০-৫০০ শব্দ) দিয়ে র্যাংক করা কঠিন। প্রতিটি আর্টিকেল কমপক্ষে ১০০০ থেকে ১৫০০ শব্দের হতে হবে। বিষয়ের গভীরে গিয়ে বিস্তারিত লিখুন।
৩. শিরোনাম বা টাইটেল: টাইটেলটি এমন হতে হবে যেন দেখলেই ক্লিক করতে ইচ্ছা করে। তবে ক্লিকবেট বা মিথ্যা তথ্য দেবেন না।
৪. ভূমিকা: আর্টিকেলের প্রথম প্যারাগ্রাফেই পাঠককে আটকে ফেলতে হবে। তারা যা খুঁজছে তার উত্তর যে এখানে আছে, তা বোঝাতে হবে।
৫. ছোট প্যারাগ্রাফ: বিশাল টেক্সট ব্লক কেউ পড়ে না। ২-৩ লাইনের ছোট প্যারাগ্রাফ ব্যবহার করুন।
৬. সাব-হেডিং ব্যবহার: লেখার মাঝখানে H2, H3 হেডিং ব্যবহার করে লেখাকে ভাগ করুন। এতে পড়তে সুবিধা হয়।
৭. নিজের অভিজ্ঞতা: লেখার মধ্যে নিজের মতামত, অভিজ্ঞতা বা উদাহরণ দিন। "আমি মনে করি", "আমার মতে" এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করুন। এটি এআই কন্টেন্ট থেকে আপনার লেখাকে আলাদা করবে।
৮. ছবি এবং ভিডিও: কপিরাইট ফ্রি ছবি ব্যবহার করুন। ক্যানভা (Canva) দিয়ে নিজের মতো করে ছবি ডিজাইন করে নিন। লেখার মাঝখানে চার্ট, গ্রাফ বা ইনফোগ্রাফিক্স দিলে গুগল খুব পছন্দ করে।
এআই (AI) কন্টেন্ট এবং গুগল এডসেন্স:
সতর্কবাণী! চ্যাটজিপিটি বা অন্য এআই দিয়ে হুবহু আর্টিকেল লিখে ব্লগে পোস্ট করবেন না। গুগল এখন এআই কন্টেন্ট সহজেই ধরতে পারে। আপনি এআই এর সাহায্য নিতে পারেন আউটলাইন বা আইডিয়া নেওয়ার জন্য, কিন্তু লেখাটা নিজের ভাষায়, নিজের ইমোশন দিয়ে লিখতে হবে। গুগল চায় "Helpful Content"। এআই যদি ভুল ভাল তথ্য দেয় বা রোবোটিক ভাষায় লেখে, তবে আপনি "Low Value Content" এর কারণে রিজেক্ট খাবেন।
ধাপ ৫: এসইও (SEO) বা সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন
লেখা তো হলো, এবার তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। এর জন্য দরকার এসইও। এসইও দুই প্রকার।
অন-পেজ এসইও:
আর্টিকেলের ভেতরে কিওয়ার্ড সঠিক জায়গায় বসানো। ইউআরএল (URL) ছোট রাখা। ছবির অল্ট টেক্সট (Alt Text) দেওয়া। ইন্টারনাল লিংকিং (নিজের সাইটের এক লেখার সাথে অন্য লেখার লিংক) এবং এক্সটারনাল লিংকিং (অন্য ভালো সাইটের সোর্স লিংক) করা।
অফ-পেজ এসইও:
আপনার সাইটের পরিচিতি বাড়ানো। সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করা। অন্য ভালো সাইট থেকে ব্যাকলিংক নেওয়া। তবে স্প্যামি ব্যাকলিংক বা টাকা দিয়ে ব্যাকলিংক কেনা থেকে বিরত থাকুন। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
গুগল সার্চ কনসোল এবং অ্যানালিটিক্স:
সাইট বানানোর সাথে সাথেই গুগল সার্চ কনসোলে সাইট সাবমিট করুন এবং সাইটম্যাপ জমা দিন। এটি গুগলকে আপনার সাইট খুঁজে পেতে সাহায্য করে। আর গুগল অ্যানালিটিক্স দিয়ে দেখুন কতজন ভিজিটর আসছে, তারা কী পড়ছে।
ধাপ ৬: এডসেন্স এর জন্য আবেদন করার সঠিক সময়
কখন আবেদন করবেন? এই ভুলটি সবাই করে। ২-৪টি পোস্ট করেই আবেদন করে দেয়।
আমার পরামর্শ হলো:
১. সাইটের বয়স অন্তত ১ থেকে ২ মাস হতে দিন।
২. সাইটে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০টি হাই কোয়ালিটি (১০০০+ শব্দের) ইউনিক আর্টিকেল থাকতে হবে।
৩. সাইটে প্রতিদিন অন্তত ৫০-১০০ অর্গানিক ভিজিটর (গুগল সার্চ থেকে) আসা শুরু হলে আবেদন করুন।
৪. সাইটের নেভিগেশন এবং পেজগুলো ঠিক আছে কিনা চেক করুন।
আবেদন করার প্রক্রিয়া:
গুগল এডসেন্স এর ওয়েবসাইটে যান, সাইন আপ করুন এবং তাদের দেওয়া কোডটি আপনার ওয়েবসাইটের হেড সেকশনে বসিয়ে দিন। এরপর অপেক্ষা করুন। সাধারণত ২৪ ঘণ্টা থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে তারা জানিয়ে দেয়।
ধাপ ৭: রিজেকশন হ্যান্ডেল করা বা প্রত্যাখ্যান সামলানো
যদি প্রথমবার রিজেক্ট করে, মন খারাপ করবেন না। ৯০% মানুষ প্রথমবার রিজেক্ট হয়। মেইলে কারণ লেখা থাকে।
সবচেয়ে সাধারণ কারণ: Low Value Content
এর মানে হলো আপনার লেখায় নতুন কিছু নেই, বা লেখাগুলো খুব ছোট, অথবা ইন্টারনেটে ইতিমধ্যে আছে এমন তথ্য আপনি কপি করেছেন।
সমাধান: আরো ৫-১০টি ভালো মানের গভীর আর্টিকেল লিখুন। আগের ছোট আর্টিকেলগুলো ডিলিট করুন বা বড় করুন। তারপর আবার আবেদন করুন।
ধাপ ৮: ইনকাম বাড়ানো এবং পেমেন্ট তোলা
এপ্রুভাল পাওয়ার পর আসল কাজ শুরু। ইনকাম নির্ভর করে ৩টি বিষয়ের ওপর:
১. ট্রাফিক (কত জন আসছে)
২. সিপিসি (Cost Per Click - প্রতি ক্লিকে কত দিচ্ছে)
৩. সিটিআর (Click Through Rate - কত শতাংশ মানুষ এডে ক্লিক করছে)
ইনকাম বাড়ানোর টিপস:
১. আমেরিকা, কানাডা, বা ইউরোপের ট্রাফিক টার্গেট করতে পারলে ইনকাম ১০ গুণ বেড়ে যায়। ইংরেজিতে ব্লগিং করলে এটি সম্ভব।
২. এড প্লেসমেন্ট ঠিক রাখুন। আর্টিকেলের শুরুতে, মাঝখানে এবং শেষে এড দিন। অটো এডস (Auto Ads) চালু রাখতে পারেন, গুগল নিজেই বুঝে নেবে কোথায় এড দেখাতে হবে।
৩. নিয়মিত কন্টেন্ট আপডেট করুন। থেমে যাবেন না।
পেমেন্ট মেথড:
আপনার ইনকাম যখন ১০ ডলার হবে, গুগল আপনার ঠিকানায় একটি চিঠি (PIN Code) পাঠাবে। এটি দিয়ে আপনার ঠিকানা ভেরিফাই করতে হবে। এরপর ১০০ ডলার পূর্ণ হলেই ব্যাংকে টাকা ট্রান্সফার করার অপশন পাবেন। বাংলাদেশে বা ভারতে যেকোনো অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধাযুক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা চলে আসে।
২০২৬ সালের বিশেষ টিপস: ভিডিও এবং ভয়েস সার্চ
২০২৬ সালে মানুষ পড়ার চেয়ে দেখতে বেশি পছন্দ করবে। তাই আপনার ব্লগের সাথে একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলুন। ব্লগের লেখাটিকেই ভিডিও আকারে দিন এবং ব্লগে ভিডিওটি এম্বেড করুন। এতে ইউজার এনগেজমেন্ট বাড়বে। এছাড়া মানুষ এখন টাইপ না করে ভয়েস কমান্ড দিয়ে সার্চ করে। তাই আপনার লেখাগুলো যেন কথ্য ভাষায় এবং প্রশ্নোত্তর আকারে হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
উপসংহার: ধৈর্যের খেলা
বন্ধুরা, গুগল এডসেন্স থেকে ইনকাম করা কোনো জুয়া খেলা নয়, এটি একটি সাধনা। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আপনি যদি মানসম্মত তথ্য মানুষকে দিতে পারেন, মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তবে টাকা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে আসবেই। শর্টকাট খুঁজবেন না। নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করুন। আজ শুরু করলে আগামী ৬ মাস বা ১ বছর পর আপনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন। মনে রাখবেন, "Content is King, but Consistency is Queen." অর্থাৎ কন্টেন্ট রাজা হলে, নিয়মিত কাজ করা হলো রানি। দুটোই লাগবে।
শুভকামনা আপনার ব্লগিং যাত্রার জন্য।
প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ) - আপনার মনের সব প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন ১: এডসেন্স এপ্রুভ পেতে কত দিন সময় লাগে?
উত্তর: সাধারণত গুগল আবেদন করার পর ২ সপ্তাহ সময় নেয় রিভিউ করার জন্য। তবে সাইট যদি খুব ভালো হয় তবে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেও এপ্রুভাল পাওয়া যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ১ মাসও লেগে যেতে পারে।
প্রশ্ন ২: আমি কি চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) দিয়ে লেখা আর্টিকেল দিয়ে এডসেন্স পাবো?
উত্তর: সরাসরি চ্যাটজিপিটি থেকে কপি-পেস্ট করলে "Low Value Content" বা "AI Generated Content" এর কারণে রিজেক্ট হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯%। আপনি আইডিয়া নিতে পারেন, কিন্তু লেখাটি নিজের ভাষায় এডিট করতে হবে, নিজের অভিজ্ঞতা যোগ করতে হবে এবং হিউম্যান টাচ দিতে হবে।
প্রশ্ন ৩: মাসে কত টাকা ইনকাম করা সম্ভব?
উত্তর: এর কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। এটি নির্ভর করে আপনার ট্রাফিক এবং নিসের ওপর। ১০০০ ভিজিটর থেকে আপনি ১ ডলারও পেতে পারেন আবার ১০ ডলারও পেতে পারেন। তবে গড়ে একটি সফল ব্লগ থেকে মাসে ২০০ থেকে ১০০০ ডলার বা তার বেশি আয় করা সম্ভব।
প্রশ্ন ৪: বাংলা সাইটে কি এডসেন্স পাওয়া যায়? ইনকাম কেমন?
উত্তর: হ্যাঁ, বাংলা সাইটে এখন সহজেই এডসেন্স পাওয়া যায়। তবে ইংরেজি সাইটের তুলনায় বাংলা সাইটে সিপিসি (CPC) বা এডের দাম একটু কম থাকে। কিন্তু বাংলা সাইটে ভিজিটর আনা সহজ, তাই প্রচুর ভিজিটর এনে সেই কম রেট পুষিয়ে নেওয়া যায়।
প্রশ্ন ৫: আমার সাইটে ভিজিটর নেই, আমি কি আবেদন করবো?
উত্তর: ভিজিটর ছাড়া আবেদন না করাই ভালো। গুগল দেখবে আপনার সাইটটি মানুষের কাজে আসছে কিনা। একদম ট্রাফিক শূন্য সাইটে গুগল সাধারণত এপ্রুভাল দেয় না। দিনে অন্তত ৫০-১০০ জন অর্গানিক ভিজিটর থাকলে এপ্রুভাল পাওয়া সহজ হয়।
প্রশ্ন ৬: ব্লগার (Blogger.com) ভালো নাকি ওয়ার্ডপ্রেস (WordPress)?
উত্তর: প্রফেশনাল এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য ওয়ার্ডপ্রেস অনেক ভালো। এতে এসইও করা সহজ এবং সাইটের পুরো নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে থাকে। তবে আপনার যদি বাজেট না থাকে এবং আপনি একদম নতুন শিখছেন, তবে ব্লগার দিয়ে শুরু করতে পারেন।
প্রশ্ন ৭: কপি-পেস্ট কন্টেন্ট দিয়ে কি ইনকাম হবে?
উত্তর: একদম না। গুগল এখন অনেক স্মার্ট। অন্যের লেখা চুরি করলে বা কপি করলে আপনার সাইট কখনোই র্যাংক করবে না এবং এডসেন্সও পাবেন না। এমনকি ফিউচারে এডসেন্স থাকলেও তা ব্যান হয়ে যেতে পারে।
প্রশ্ন ৮: দিনে কয়টি পোস্ট করা উচিত?
উত্তর: সংখ্যার চেয়ে মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দিনে ৫টি জঞ্জাল পোস্ট করার চেয়ে সপ্তাহে ২টা হাই-কোয়ালিটি, রিসার্চ করা পোস্ট করা অনেক ভালো। তবে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
প্রশ্ন ৯: পিন ভেরিফিকেশন (PIN Verification) চিঠি না আসলে কী করবো?
উত্তর: অনেক সময় ডাকবিভাগের সমস্যার কারণে চিঠি আসে না। ৩ বার পিন জেনারেট করার পরেও যদি চিঠি না আসে, তবে আপনি আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্টের স্ক্যান কপি দিয়ে অনলাইনে ইমেইলের মাধ্যমে ভেরিফাই করতে পারবেন।
প্রশ্ন ১০: মোবাইল দিয়ে কি ব্লগিং করে এডসেন্স পাওয়া সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, ১০০% সম্ভব। আর্টিকেল লেখা, ছবি এডিট করা এবং সাইট ম্যানেজ করার সব কাজ মোবাইল দিয়েই করা যায়। তবে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ থাকলে কাজগুলো অনেক দ্রুত এবং সহজে করা যায়।
প্রশ্ন ১১: এডসেন্স ছাড়াও কি ব্লগ থেকে আয়ের উপায় আছে?
উত্তর: অবশ্যই। এফিলিয়েট মার্কেটিং, স্পন্সরড পোস্ট, ই-বুক বিক্রি, বা নিজের সার্ভিস বিক্রি করেও ব্লগ থেকে আয় করা যায়। অনেক সময় এডসেন্সের চেয়ে এফিলিয়েট মার্কেটিংয়ে আয় বেশি হয়।
প্রশ্ন ১২: আমার বয়স ১৮ এর নিচে, আমি কি এডসেন্স খুলতে পারবো?
উত্তর: না, গুগল এডসেন্সের নিয়ম অনুযায়ী আপনার বয়স ১৮ বছর হতে হবে। তবে আপনি আপনার বাবা, মা বা বড় ভাই-বোনের নাম এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন।
প্রশ্ন ১৩: আমি কি অন্য কারো ছবি ব্যবহার করতে পারবো?
উত্তর: সরাসরি গুগল থেকে ডাউনলোড করে ছবি ব্যবহার করবেন না। কপিরাইট স্ট্রাইক আসতে পারে। Pixabay, Pexels বা Unsplash এর মতো সাইট থেকে রয়্যালটি ফ্রি ছবি ব্যবহার করুন অথবা ক্যানভা দিয়ে নিজের ছবি বানিয়ে নিন।
প্রশ্ন ১৪: কেন হঠাৎ করে আমার ইনকাম বা সিপিসি কমে গেছে?
উত্তর: সিপিসি বা ইনকাম কমা-বাড়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সিজনাল কারণে, বিজ্ঞাপণদাতার বাজেটের কারণে বা আপনার ট্রাফিকের সোর্সের পরিবর্তনের কারণে এমন হতে পারে। নিয়মিত ভালো কন্টেন্ট দিতে থাকলে এটি আবার ঠিক হয়ে যায়।
প্রশ্ন ১৫: সোশ্যাল মিডিয়া ট্রাফিক কি এডসেন্সের জন্য ভালো?
উত্তর: সোশ্যাল মিডিয়া ট্রাফিক খারাপ না, কিন্তু গুগল অর্গানিক ট্রাফিক (সার্চ ইঞ্জিন থেকে আসা) বেশি পছন্দ করে। যদি আপনার ১০০% ট্রাফিকই ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আসে, তবে "Ad Limit" বা একাউন্ট রিক্সের সম্ভাবনা থাকে। অর্গানিক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ব্যালেন্স রাখা উচিত।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন